হারিয়ে গেছে সোনালি বিকেল

0 72

‘তুমি আমার পাশে বন্ধু হে
বসিয়া থাকো, একটু বসিয়া থাকো।।
আমি মেঘের দলে আছি ঘাসের দলে আছি।।
তুমিও থাকো বন্ধু হে বসিয়া থাকো, একটু বসিয়া থাকো’
বন্ধুর সান্নিধ্য পাওয়ার জন্যই এমন আকুলতা। চোখ বুঝে এমন গান গাওয়ার মানুষেরও অভাব নেই। কিন্তু হালের পরিস্থিতি যেন বলছে ভিন্ন কথায় বলে। ফেইসবুকের প্রভাবে এখন হারিয়ে যাচ্ছে বন্ধুত্বের সেই সংজ্ঞা। এখন ফেইসবুকে এত বন্ধু যে, সামনাসামনি দেখা হলেও কেউ কাউকে চেনে না!

একটা সময় ছিল যখন স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে কিংবা পার্কে-খেলার মাঠে আড্ডায় মেতে উঠতো সহপাঠী ও বন্ধুরা। এখন সেই দৃশ্য তেমন একটা চোখে পড়ে না। কোথাও আগের মতো সেই আড্ডা আর জমে উঠে না। সবাই এখন মোবাইল ও ফেইসবুক নিয়ে ব্যস্ত। আধুনিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে পড়েছে ফেইসবুক। অনেকে ফেইসবুক ছাড়া এক মুহূর্তও যেন চলতে পারে না।

আড্ডা, লেখাপড়া, ঘোরাঘুরি এসব কিছুর সময় যেন ফেইসবুক একাই দখল করে নিয়েছে। ছোট-বড় অনেকেই ওই একটা জিনিসের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে। তবে এটাও সত্য, এমন মানুষও আছেন যাদের কাছে বিরক্তির এক নাম ফেইসবুক।

চট্টগ্রামের পোর্ট সিটি ইন্টারন্যশনাল ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে দেখা যায়, ক্যাম্পাসে সাংবাদিকতা বিভাগের একদল শিক্ষার্থী আড্ডা দিচ্ছে। তবে দূর থেকে তাদেরকে আড্ডা দিচ্ছে দেখা গেলেও কাছে গিয়ে দেখা গেল উল্টোটা। তারা একসঙ্গে বসে থাকলেও সবাই ব্যস্ত মোবাইল ও ফেইসবুক নিয়ে। কারোর প্রতি কারো মনোযোগ নেই। আড্ডায় নির্দিষ্ট কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা, গলা ছেড়ে গান কিংবা হাস্যরসে মেতে ওঠার কোনো দৃশ্য চোখে পড়েনি। বেশিরভাগের চোখ নিজের বা সহপাঠীর মুঠোফোনের দিকে।

এ প্রসঙ্গে কথা বলতে চাইলে সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী সামিরা আলিম বলেন, ফেইসবুকের কারণে আজকাল আড্ডা জমে ওঠে না। এক সময় ক্লাসের মাঝে একটা পিরিয়ড ব্রেক পেলে সবাই একসঙ্গে আড্ডায় মেতে উঠতাম। আর এখন সবার চোখ থাকে মোবাইল স্ক্রিনের দিকে, কেউ গেইমস, আর কেউ চ্যাটিং-ফেইসবুকিং নিয়ে ব্যস্ত।’

একই বিভাগের ছাত্র সুজন বড়ুয়া বলেন, আগে একটা নির্দিষ্ট সময়ে বন্ধুরা মিলে ছাদে, মাঠে, পার্কে কিংবা ক্যাম্পাসে আড্ডা দিতাম। কথা হতো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। পড়ালেখা থেকে শুরু করে টিউশন, রাজনীতি, বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড, কোনো দিবস বাদ পড়তো না এ আড্ডা থেকে। যা আজ ফেইসবুকের জোয়ারে ভেসে গেছে। এসব এখন খুব মিস করি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ পাস করা শ্রীদেব চক্রবর্তীর মুখ থেকে শোনা গেল ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, সব জিনিসের মতো ফেইসবুকেরও ভালো-খারাপ দুটো দিক আছে। কে কীভাবে ব্যবহার করবেন তা একেবারেই নিজের ওপর। এখন সময়ের অভাবে বাইরে বসে আড্ডা দিতে পারি না। তা সত্ত্বে অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয়, গল্প-আড্ডা হচ্ছে এ ফেইসবুকের মাধ্যমে।

তিনি আরও বলেন, ‘ফেইসবুক মানেই যে শুধু টাইম পাস-তা কিন্তু নয়। এ ফেইসবুকের মাধ্যমে বন্ধুরা মিলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকি। যেমন রক্তদান কর্মসূচি, শীতবস্ত্র সংগ্রহ, অসহায় ও অসুস্থ মানুষের জন্য অর্থ সংগ্রহসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজও করে থাকি। এছাড়া ফেইসবুকের মাধ্যমে স্কুলের অনেক পুরনো বন্ধুদেরও খুঁজে পেয়েছি, যা আমার কাছে সবচেয়ে বেশি আনন্দের।

শ্রীদেবের কথার সত্যতা মিলল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আসতেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ক্যান্সার আক্রান্ত সহপাঠীর পাশে দাঁড়াতে একদল শিক্ষার্থী টিনের বাক্স নিয়ে অর্থ সংগ্রহ করছেন। কথা বলে জানা যাই, তারা ফেইসবুকে গ্রুপ খুলে সব বন্ধুরা মিলে এমন মানবিক কাজে এগিয়ে আসছেন। তারা ইভেন্ট খুলে শীতবস্ত্র, বন্যার্তদের জন্য অর্থ, জরুরি রোগীদের জন্য রক্ত সংগ্রহ করেন।

আসলে এ চিত্রটা শুধু পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির নয়। চট্টগ্রামের বেশিরভাগ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরই প্রায় একই অবস্থা। স্মার্ট ফোনের ফেইসবুক জমানায় সোনালি অতীতের বন্ধুত্বের বন্ধন খুঁজতে যাওয়াটা একটু বেমানানই বটে!

হেমন্ত মুখার্জীর ‘বন্ধু তোমার পথের সাথীকে চিনে নিও/মনের মাঝেতে চিরদিন তাকে ডেকে নিও’ এই আহ্বান স্মরণে রাখলে সত্যিকারের বন্ধু খুঁজে পাওয়া হয়তো কঠিন নয়, তা সে যে মাধ্যমেই হোক।
বন্ধুত্বের জয় হোক।

Leave A Reply

Your email address will not be published.