টাইগারদের বেদনাদায়ক যত হার

0 64

জয়নিউজবিডি ডেস্ক: দুই ওভারে ১৪ রান দরকার, হাতে ছয় উইকেট। এই আজকালকার দুনিয়ায় কেউ হারে? কিন্তু তালগোল পাকিয়ে প্রায় জেতা ম্যাচ হেরে যাওয়াটা যে অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেছে টাইগাররা। ইদানীং এই কাজটা আরও বেশি হচ্ছে।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্টে ভরাডুবির পর তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে দারুণ জয়ে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। গত রাতে আরও আরেক জয়ে সিরিজ জয় হয়ে যেত। কিন্তু দুই ওভারে ১৪ আর এক ওভারে আট রানের সহজ সমীকরণকে ধূলায় মিশিয়ে তিন রাতের হারে হ্রদয় ভাঙে বাংলাদেশের।

টেস্টে আর টি টোয়েন্টিতে হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পরও ওয়ানডে ক্রিকেটে ঠিকই বাংলাদেশ ভালো করে যাচ্ছে। তবে সব ধরনের ক্রিকেটেই বাংলাদেশের পরিসংখ্যানটা আরও ভালো হতে পারত, যদি না শেষ সময়ের মানসিক দৃঢ়তাটা দেখানো যেত।

গত ৭ জুন ভারতের দেরাদুনে যে টি টোয়েন্টি ম্যাচ হেরে আফগানিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশ হোয়াইটওয়াশ হয়, সেটিও জেতা উচিত ছিল টাইগারদের।

আফগানদের ১৪৫ রানে বেঁধে ফেলা বাংলাদশের শেষ ওভারে জয়ের জন্য দরকার ছিল ৯ রান। কিন্তু ওভারের প্রথম বলেই রশিদ খানকে স্লগ সুইপে ডিপ মিডউইকেট দিয়ে উড়িয়ে মারতে গিয়ে আউট হন। এরপর আরিফুল হকের একটি চারের পরও শেষ বলে মাহমুদউল্লাহর রান আউটে এক রানে হেরে যায় টাইগাররা।

গত ১৮ মার্চে নিদাহাস ট্রফির ফাইনালেও একই দশা। প্রথমে ব্যাট করে ১৬৬ রান তোলা বাংলাদেশ ১৩৩ রানে ভারতের যখন পাঁচ উইকেট ফেলে দেয়, তখন ম্যাচের বাকি কেবল দুই ওভার। এই ১২ বলে জিততে হলে ভারতের দরকার ছিল ৩৪ রান। উইকেটে নতুন ব্যাটসম্যান দিনেশ কার্তিক। আর অভাবনীয়ভাবে রুবেলের এক ওভারে ২২ রান তুলে নিলেন তিনি।

শেষ ওভারে ব্যাটসম্যান সৌম্য চেষ্টা করেছিলেন। পাঁচ বলে সাত রান দিয়ে আবার জয়ের স্বপ্ন ফিরিয়ে আনেন। শেষ বলটাও ছিল বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে। অফ স্ট্যাস্পের একটু বাইরে লো ফুলটস বলে ছক্কা মারা প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু সেটিই করলেন কার্তিক, হেরে গেল বাংলাদেশ।

২০১৬ সালের ২৩ মার্চ ভারতের বেঙ্গালুরুতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সুপার টেনের ম্যাচে ভারতকে ১৪৬ রানে আটকে দেয়ার পর বাংলাদেশ যেভাবে হেরেছে, সেটি চেষ্টা করেও কোনো দল পারবে না।

শেষ ওভারে দরকার ১১ রান। প্রথম তিন বলেই এসেছে ৯ রান। বাকি ৩ বলে ২ রানের সহজ সমীকরণ। হাতে চার উইকেট। কিন্তু ১৪৫ রানেই পরপর তিন বলে তিন জন আউট হয়ে অবিশ্বাস্যভাবে ম্যাচ হেরে যায় টাইগাররা। তাও আবার উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসেন মুশফিক, মাহমুদউল্লাহর মতো প্রতিষ্ঠিত ব্যাটসম্যান।

২০১৬ সালের ৮ অক্টোবর মিরপুরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২১ রানের পরাজয়ের পরিসংখ্যানে বুঝা যাবে না কতটা হতাশার ছিল সে ফলাফল। সফরকারীরা প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ৩০৯ রান তুলে ফেলার পর জয়ের স্বপ্ন দেখা মানুষের সংখ্যা হয়ত বেশি ছিল না। কিন্তু ৪১ ওভার ২ বলে ৪ উইকেটে ২৭১ রান তুলে ফেলা টাইগারদের সামনে ৫২ বলে দরকার ছিল কেবল ৩৯ রান। কিন্তু যেখানে সিঙ্গেলের ওপর খেলে জিতে যাওয়া যায়, সেখানে চার ছক্কায় বাজিমাত করার চেষ্টা করতে গিয়ে পথ হারায় বাংলাদেশ।

বেদম পিটুনি খাওয়া ইলিংশ বোলাররা হঠাৎ ভয়ঙ্কর হয়ে ১৭ রানে ছয় উইকেট ফেলে জিতিয়ে দেন দলকে।

২০১২ সালের ২২ মার্চ এশিয়া কাপের ফাইনালে পাকিস্তানের কাছে দুই রানের হারেও হৃদয়ে কষ্ট বাড়ায় টাইগার সমর্থকদের। সেদিন সাকিব, মুশফিকদের সঙ্গে কেঁদেছিল গোটা মিরপুর স্টেডিয়াম। উচ্চস্বরে মানুষের এই কান্না এর আগে ক্রিকেট বিশ্ব কখনও দেখেছে কি?

পাকিস্তানকে ২৩৬ রানে বেঁধে ফেলে শেষ বল পর্যযন্ত লড়াই করে দুই রানে হার মানতে হয় টাইগারদের। অথচ ৪২ ওভারেই তিন উইকেটে ১৭০ রান তুলে ফেলেছিল তারা। আর আট ওভারে সাত উইকেট হাতে নিয়ে ৬৭ রান খুব বড় মনে হয়নি।

২০০৯ সালের ১৬ জানুয়ারি ঘরের মাঠে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের ফাইনালে শ্রীলংকার কাছে দুই উইকেটে হারাটা ছিল আরও বিস্ময়কর। বাংলাদেশ ১৫২ রানের ছোট স্কোর করার পরও ১১৪ রানে শ্রীলঙ্কার আট উইকেট ফেলে দিয়ে জয় দেখছিল টাইগাররা।

অসম্ভব কঠিন সেই উইকেটে বোলার মাহরুফের ৭৬ বলে ৩৮ রানের চেয়ে অকল্পনীয় ছিল ব্যাংটি সেভাবে না পারা মুরালিধরনের ‘গেইল’ হয়ে গিয়ে ২১ বলে ৩৩ রান তুলে ফেলা। ১১ বল বাকি থাকতেই হার মানতে হয় বাংলাদেশকে।

২০০৬ সলের ২ আগস্ট জিম্বাবুয়ের হারারে ওয়ানডেতে হারেরও কোনো ব্যাখ্যা করা যাবে না। প্রথমে ব্যাট করে ২৩৬ রান তোলা টাইগাররা স্বাগতিকদের সাত উইকেট ফেলে দেয় ১৫১ রানে।

কিন্তু বোলার মুপারিয়ার ৩৫ বলের ৩৩ আর ব্রেন্ডন টেইলরে বীরত্বেও ম্যাচটি তারা জিততে পারত না যদি না শেষ ওভারে মাশরাফি ১৮ রান দিয়ে বসতেন।

জিম্বাবুয়ের দরকার ছিল ১৭ রান। প্রথম বলে এক রান হওয়ার পর পাঁচ বলে দরকার ছিল ১৬ রান। এর পর তিন বলে হয় সাত রান। ফলে শেষ তিন বলে দরকার ছিল ৯ রান। আর শেষ বলে পাঁচ রান। কিন্তু টেইলরের ছক্কায় মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ।

২০০৬ সালের এপ্রিলে ঢাকা টেস্টে সেই সময় অপ্রতিরোধ্য অস্ট্রেলিয়াকেও চেপে ধরে ম্যাচ হারতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। ব্রেটলি, স্টুয়ার্ট ক্লার্ক, শেন ওয়ার্ন, ম্যাক গিলের বিশ্বসেরা বোলিংকে তুলোধুনো করে প্রথম ইনিংসে ৪২৭ রানটা অনেক বড় হয়ে যায় অস্ট্রেলিয়ার জন্য। ২৬৯ রানেই গুটিয়ে পড়ে তারা। দ্বিতীয় ইনিংসে টাইগারদের ১৪৮ রানে অস্ট্রেলিয়ার সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় ৩০৭ রান।

চতুর্থ ইনিংসে ৯৩ রাতে অস্ট্রেলিয়ার ছয় উইকেট আর ১৫৭ রানে সাত উইটেক ফেলে দেয়ার পর জয় যখন হাতের মুঠোয় মনে হচ্ছিল, তখন অপ্রত্যাশিকভাবে দেয়াল হয়ে দাঁড়ান ব্রেট লি। তার ২৯ রান এবং পরে গিলেস্পির ১৮ বলে আউট না হওয়ার সুযোগে পন্টিং এর শতরানে ম্যাচ জিতে যায় অস্ট্রেলিয়া।

২০০০ সালের ২৬ জুন টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর শক্তিশালী ভারতের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে বড় স্কোর গড়ার পর ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের বারবার সুযোগ দিয়ে টেস্ট হেরেছিল টাইগাররা।

সেটা তেমন আফসোস না জাগালেও ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের মুলতান টেস্টে হারাটা ছিল বিস্ময়কর। প্রথম ইনিংসে ২৮১ রান করে স্বাগতিকদেরকে ১৭৫ রানে বেঁধে ফেলার পর কঠিন উইকেটে দ্বিতীয় ইনিংসে ১৫৪ রান তুলে টাইগাররা।

আম্পায়ারের একের পর এক বাজে সিদ্ধান্তের পরও ২৬১ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে পাকিস্তান ১৬৪ রানে সাত উইকেট এবং ২০৮ রানে আট উইকেট হারিয়ে ফেলে। কিন্তু ইনজামাম উল হক আর ওমর গুলের ব্যাটের পাশাপাশি আম্পায়ারের বদৌনতায় নবম উইকেট জুটিতে ৫২ রানের জুটিতে এক উইকেটে হেরে প্রথম টেস্ট জেতা পিছিয়ে যায় বাংলাদেশের।

Leave A Reply

Your email address will not be published.